জিজ্ঞাসা ও জবাব

জিজ্ঞাসা ও জবাব – ৩

জিজ্ঞাসা : ৩। পরীক্ষার কারণে আমার পড়া-শুনার খুবই চাপ থাকায় ছাত্রজীবনে এক রমাদান মাসে আমি রোযা রাখতে পারিনি। এখন আমার করণীয় কী?

জবাব ।। আলহামদু লিল্লাহ। ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা রাসূলিল্লাহ। ওয়া বা’দ-

এক.

রমাদান মাসে রোযা পালন ইসলামের অন্যতম একটি ভিত্তি। যে ভিত্তিগুলোর উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

بُنِيَ الإِسْلامُ عَلَى خَمْسٍ : شَهَادَةِ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ، وَإِقَامِ الصَّلاةِ ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ ، وَالْحَجِّ ، وَصَوْمِ رَمَضَان

“ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।  এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল, নামায কায়েম করা, যাকাত দেয়া, হজ্জ আদায় করা এবং রমাদান মাসে রোযা পালন করা।”

সুতরাং যে ব্যক্তি রোযা ত্যাগ করল সে ইসলামের একটি রোকন ত্যাগ করল এবং কবিরা গুনাহে লিপ্ত হলো। বরঞ্চ সালফে সালেহিনদের কেউ কেউ এ ধরনের ব্যক্তিকে কাফির ও মুরতাদ মনে করতেন। আমরা এ ধরনের গুনাহ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। ইমাম যাহাবী তার ‘আল-কাবায়ের’ গ্রন্থে(পৃঃ ৬৪)বলেছেন : “মুমিনদের মাঝে স্বীকৃত যে, যে ব্যক্তি কোনো রোগ বা কারণ ছাড়াই রমাদান মাসে রোযা ত্যাগ করে, সে ব্যক্তি যিনাকারী ও মদ্যপায়ী মাতালের চেয়েও নিকৃষ্ট। বরং তাঁরা তার ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন এবং তার মাঝে ইসলামদ্রোহিতা ও বিমুখতার ধারণা করেন।”

দুই.

পরীক্ষার কারণে রোযা না-রাখার ব্যাপারে শাইখ আবদুল্লাহ বিন বায রাহিমাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি বলেছেন, “একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ ব্যক্তির জন্য রমাদান মাসে পরীক্ষার কারণে রোযা না-রাখা কোনো মতেই জায়েয নয়। কারণ পরীক্ষাটি শরিয়ত অনুমোদিত ওজর নয়। কাজেই তার জন্য রোজা পালন করা ওয়াজিব। দিনের বেলায় পড়া-শুনা করা তার জন্য কষ্টকর হলে সে রাতের বেলায় পড়া-শুনা করতে পারে।আর পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের উচিত ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং রমাদান মাসের পরিবর্তে অন্য সময়ে পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করা। এর ফলে দুইটি সুবিধার মধ্যে সমন্বয় করা যায়। ছাত্র-ছাত্রীদের সিয়াম পালন ও পরীক্ষায় প্রস্তুতির জন্য অবসর সময় পাওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে সহীহ হাদীসে এসেছে তিনি বলেন : “হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের যে কোনো পর্যায়ের কর্তৃত্ব লাভ করে তাদের সাথে কোমল হয় আপনিও তার প্রতি কোমল হন। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কর্তৃত্ব পেয়ে তাদের সাথে কঠোর হয় আপনিও তার সাথে কঠোর হন।”(সহিহ মুসলিম)

তাই পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ-কর্তৃপক্ষের প্রতি উপদেশ হলো- তাঁরা যেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি সহমর্মী হন। রমাদান মাসে পরীক্ষা না দিয়ে রমাদানের আগে বা পরে পরীক্ষার সময়সূচী নির্ধারণ করেন। আমরা আল্লাহর কাছে সবার জন্য তাওফিক প্রার্থনা করি।” (ফাতাওয়া আশ-শাইখ ইবনে বায (৪/২২৩)

তিন.

আপনি যদি এই ভেবে রোযা না-রেখে থাকেন যে, পরীক্ষার কারণে রোজা না-রাখা জায়েয, তবে আপনার উপর শুধু কাযা করা ওয়াজিব। আপনার যেহেতু ভুল ধারণা ছিল এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আপনি হারামে লিপ্ত হননি তাই আপনার ওজুহাত গ্রহণযোগ্য। আর আপনি যদি তা হারাম জেনেও রোজা না-রাখেন তবে আপনার উপর অনুতপ্ত হওয়া, তওবা করা এবং পাপ কাজে পুনরায় ফিরে না আসার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা ওয়াজিব। আপনার উচিত বেশি বেশি ভালো কাজ করা, নফল রোজা রাখা; যাতে করে ছুটে যাওয়া ফরজ ইবাদতের ঘাটতি পূরণ করে নিতে পারেন।

শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহকে রমাদানে দিনের বেলায় বিনা ওজরে পানাহারের হুকুম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেন : রমাদানে দিনের বেলায় বিনা ওজরে পানাহার করা মারাত্মক কবিরা গুনাহ। এতে করে ব্যক্তি ফাসেক হয়ে যায়। তার উপর ওয়াজিব হচ্ছে- আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং রোযা না-রাখা দিনগুলোর কাযা রোযা পালন করা। অর্থাৎ সে যদি রোযা শুরু করে বিনা ওজরে দিনের বেলায় রোযা ভেঙ্গে ফেলে তাহলে তার গুনাহ হবে এবং তাকে সে দিনের রোযা কাযা করতে হবে। কারণ সে রোযাটি শুরু করেছে, সেটি তার উপর অনিবার্য হয়েছে এবং সে ফরজ জেনে সে আমলটি শুরু করেছে। তাই মান্নতের ন্যায় এর কাযা করা তার উপর আবশ্যক। আর যদি শুরু থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা ওজরে রোযা ত্যাগ করে তবে অগ্রগণ্য মত হলো,  তার উপর কাযা আবশ্যক নয়। কারণ কাযা করলেও সেটি তার কোনো কাজে আসবে না। যেহেতু তা কবুল হবে না।

শরয়ী কায়েদা হলো- নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পৃক্ত কোনো ইবাদত যখন বিনা ওজরে সে নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করে না, সেটা আর কবুল করা হয় না। কারণ নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

من عمل عملاً ليس عليه أمرنا فهو رد

“যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করলো যা আমাদের দ্বীনে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহীহ বুখারী : ২০৩৫, সহীহ মুসলিম : ১৭১৮)

তাছাড়া এটি আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন। আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমানা লঙ্ঘন করা জুলুম বা অন্যায়। জালিমের আমল কবুল হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُون  

“যারা আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখা লঙ্ঘন করে তারা জালিম (অবিচারী)।”  (আল-বাক্বারাহ : ২২৯)

এছাড়া সে ব্যক্তি যদি এই ইবাদতটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে পালন করতো তবে তা তার কাছ থেকে কবুল করা হতোনা, অনুরূপভাবে কোনো ওযর ছাড়া সে যদি নির্দিষ্ট সময়ের পরে তা আদায় করে তবে সেটাও তার কাছ থেকে কবুল করা হবে না।

[মাজমূয়ায়ে ফাতাওয়াশ শাইখ ইবনে উছাইমীন (১৯/প্রশ্ন নং ৪৫)]

জবাবের সারাংশ :

আপনি যদি পরীক্ষার কারণে রোযা না-রাখা জায়েয মনে করে রোজা না-রেখে থাকেন অথবা রোজা শুরু করে দিনে ভেঙ্গে ফেলেন তাহলে আপনাকে কাযা পালন করতে হবে; কাফফারা আদায় করতে হবে না।আপনার উচিত বেশি বেশি করে তাওবা করা। আমরা দোয়া করছি যাতে আল্লাহ আপনার তওবা কবুল করেন।

লিখেছেন :

মো: মোহিব্বুল্লাহ আজাদ

মুহাদ্দিস, লেখক, গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবীদ।

Related Posts