দৈনন্দিন জীবন

রমাদানের আগমন : আমাদের করণীয়

ভূমিকা :

রমাদান মাস আরবী মাসসমূহের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত মাস। এটি কুরআন নাযিলের মাস। এ মাসে পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে এ মাসের মর্যাদা ও সম্মান অন্যান্য মাসের তুলনায় অত্যধিক। কাজেই এ মাস আসলেই আমাদের উপর যে দায়িত্ব বর্তায় তা হলো পারলৌকিক উন্নতি ও সফলতা লাভের জন্য গুরুত্বের সাথে রোযা পালন করা। আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনে রোযা একটি অপরিহার্য ইবাদত। ব্যক্তির আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন এবং তাকওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণের নিমিত্তে ইসলামী শরীয়তে রোযার বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল, যাতে করে তোমরা মোত্তাকী হতে পারো।’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)।

রমাদান :

রমাদান বলতে রমাদান মাসকে বুঝানো হয়। রমাদান মাস আরবী বারো মাসের মধ্যে নবম মাস। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সম্মানিত মাস। রমাদান শব্দটি আরবী ‘রামদুন’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হচ্ছে, উত্তপ্ত হওয়া,দগ্ধ হওয়া,পুড়ে যাওয়া ইত্যাদি। রোযার মাধ্যমে যেরূপ মানুষের কুপ্রবৃত্তি জ্বলে-পুড়ে যায় তেমনি ক্ষুধা বা পিপাসার জ্বালায় তার পেট উত্তপ্ত ও দ্বগ্ধ হয়ে যায়, তাই একে রমাদান বলা হয়।

রোযা :

রোযা ফারসি শব্দ। এর আরবী প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘সাওম’। আর ‘সাওম’ এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, ক. কাজ থেকে বিরত থাকা, খ. কঠোর সাধনা করা, গ. অবিরাম প্রচেষ্টা, ঘ. আত্মসংযম ঙ. খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। আর ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, ‘সাওম’ তথা রোযা হলো সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকা।

রোযার উদ্দেশ্য :

রোযার মাধ্যমে মানুষকে সৎ ও চরিত্রবান বানানোই হলো রোযার প্রকৃত উদ্দেশ্য। রোযা রাখার পরও যদি কেউ চরিত্রবান না হয়; সততার উপর নিজের জীবনের ভিত্তি রচনা করতে না পারে, রমাদানের মধ্যেও অসত্য ও নিরর্থক কথাবার্তা পরিত্যাগ করতে না পারে এবং রমাদানের বাইরে নিজের জীবনে সততা ও পরিচ্ছন্নতা দেখা না দেয়, তাহলে তার ভাবতে হবে যে, সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাস থেকে তার কোনো লাভ হয়নি। হাদীসে এসেছে- ‘হযরত আবু হোরায়রা (রা) হতে হাদীস বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার উপর আমল করা ছাড়তে পারেনি, তার খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য বর্জন করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ সহীহ বুখারী, খণ্ড ২, হাদীস : ৬৭৩)।

অপর হাদীসে এসেছে- ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এমন কতিপয় রোযাদার রয়েছে যারা তাদের রোযার দ্বারা ক্ষুধা পিপাসার কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পায় না। এমন কতিপয় নামাযে দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত জাগরণকারী আছে যারা শুধু রাত জাগা ছাড়া আর কিছুই পায় না। (ইবনে মাযাহ, খণ্ড ১, হাদীস : ৫৩৯)।

সুতরাং আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, শুধু পানাহার ছেড়ে দিলেই রোযা হয় না। রোযার আসল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রোযা পালন করতে হবে।আর তা হলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে সৎ ও চরিত্রবান হওয়া।

রোযা ফরয হওয়ার হেকমত ও উপকারিতা :

ইসলামী শরীয়তে রোযার বিধান প্রবর্তনের পিছনে বহু হেকমত, উপকারিতা ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিদ্যমান। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-

১. রোযার মাধ্যমে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জিত হয়।

২. রোযা মহাপ্রভুর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম।

৩. রোযার মাধ্যমে অফুরন্ত রহমত লাভ করা যায়। যেমন হাদীসে এসেছে- রমযানের আগমনে রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়।

৪. জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম। যেমন হাদীসে এসেছে- রমযানের আগমনে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়।

৫. রোযা দ্বারা ব্যক্তির চরিত্র বিধ্বংসী কুপ্রবৃত্তি দমন হয়।

৬. রোযা দ্বারা ব্যক্তির চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা ও লজ্জাস্থান প্রভৃতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অতিরিক্ত চাহিদা অবদমিত হয়।

৭. রোযার মাধ্যমে ব্যক্তি কুপ্রবৃত্তি ও প্রলোভনের ওপর জয়ী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয়।

৮. রোযা দ্বারা অন্তরের যাবতীয় মলিনতা ও কুটিলতা দূর হয়।

৯. রোযা ব্যক্তিকে যাবতীয় অবাঞ্ছিত কাজ হতে বিরত থাকতে অভ্যস্ত করে তোলে।

১০. রোযা শয়তানের আক্রমণ প্রতিহত করার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। যেমন হাদীসে এসেছে- ‘রোযা ঢাল স্বরূপ।’

১১. রোযার কারণে ক্ষুধার অনুভ‚তি ধনীর অন্তরে দরিদ্রের জন্য সহানুভ‚তি জাগিয়ে তোলে এবং দরিদ্রকে সাহায্য করার মানসিকতা সৃষ্টি করে।

১২. রোযার মাধ্যমে ক্ষুধার তীব্র পীড়নে জর্জরিত গরিবদের প্রতি ধনীদের অন্তরে বেদনার অনুভ‚তি জাগ্রত হয়।

১৩. রোযা পালনের মাধ্যমে অতীতের গুনাহসমূহের ক্ষমা পাওয়া যায়। যেমন হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় রোযা পালন করে, তার পূর্বাপর গুনাহসমূহকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।’

১৪. রোযা বিশ্বমুসলিম সমাজে সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সৃষ্টি করে।

১৫. রোযার মাধ্যমে আত্নশুদ্ধিসহ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও নম্র স্বভাবের গুণে গুণানি¦ত হওয়া যায়।

১৬. রমাদান হলো কুরআন নাযিলের মাস। কুরআনের আলোকে সমাজ বিনির্মাণের প্রেরণা যোগায় পবিত্র মাহে রমাদান।

১৭. রোযা জান্নাতে প্রবেশের এক উত্তম মাধ্যম। হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে- ‘জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে, তম্মধ্যে একটি দরজার নাম হচ্ছে রাইয়্যান। এটি দিয়ে একমাত্র রোযাদারগণই প্রবেশ করবে।’

১৮. স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। যেমন হাদীসে কুদসীতে এসেছে- ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, রোযা কেবলমাত্র আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দিব।’

১৯. পাপাচার ও অবাঞ্ছিত কাজ হতে বিরত রাখে।

২০. স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে অনুপ্রাণিত করে।

২১. বিভিন্ন রোগজীবাণু ধ্বংস ও শারীরিক সুস্থতা আনয়ন করে।

২২. মানসিক প্রশান্তি লাভের অন্যতম মাধ্যম।

২৩. রোযাই মানুষকে আল্লাহ ও বান্দার অধিকার আদায়ে যোগ্য করে তোলে।

পরিশেষে বলা যায়, বান্দাকে সঠিক ও সরল পথে পরিচালিত করার জন্য রোযা হচ্ছে সঠিক Guide line. সার্বিক দিক থেকে সংযমী হওয়ার মাধ্যমে মানুষের চরিত্র গঠনের এক অনন্য পন্থা।

রোযার ফযিলত :

রোযার ফযিলত ও গুরূত্ব অপরিসীম। কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য স্থানে এ ব্যাপারে বর্ণনা এসেছে। যেমন-

১. রোযা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। একজন মুমিন রোযার যাবতীয় নিয়মনীতির দাবি রক্ষাপূর্বক রোযা আদায় করলে সে অবশ্যই তাকওয়াবান হবে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী- ‘হে মুমিনগন ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল, যাতে করে তোমরা তাকওয়াবান হতে পার।’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)।

২. রোযা রাখলে রোযাদারের অতীত জীবনের যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রমযানের রোযা রাখবে, তার পিছনের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।

৩. কেয়ামতের কঠিন মুহ‚র্তে রোযা বান্দার মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ‘রোযা বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার এবং প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমাদের সুপারিশ কবুল কর।’

৪. রোযা একমাত্র আল্লাহর প্রেম ও ভালোবাসার নিদর্শন। রোযার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ লাভ করে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘রোযা আমার জন্য এবং এর পুরস্কার আমিই দেব।’

৫. শয়তানের প্রবঞ্চনা ও কুপ্রবৃত্তির প্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্য রোযা ঢালস্বরূপ। রোযা রাখলে বান্দা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পারে। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ‘রোযা ঢাল স্বরূপ।’

৬. রোযাদার ব্যক্তির ওপর আল্লাহ তায়ালা অতিশয় সন্তুষ্ট থাকেন। তার সকল কার্যকলাপকে তিনি পছন্দ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের চেয়ে বেশি সুঘ্রাণযুক্ত।’ অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোযা রাখবে, তাকে জাহান্নাম থেকে ১০০ বছরের দূরত্বে রাখা হবে।’

৭. রোযা মূলত আত্মিক শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্নিক শক্তির অন্যতম সোপান। রোযার আত্মিক শিক্ষা প্রকৃত রোযা পালনকারীর সমগ্র জীবনে কল্যাণকর প্রভাব বিস্তার করে। যেমন আল্লাহ তায়ালার বাণী- ‘লাআল্লাকুম তাত্তাকূন।’

৮. রোযা মানুষের চিন্তাচেতনা এবং অনুভ‚তিতে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকারোক্তি ও অঙ্গীকার সুদৃঢ় করে। রোযার মাধ্যমেই বান্দা স্বেচ্ছায় মহান আল্লাহর ইবাদতের প্রতি গভীর মনোযোগী হয়।

৯. ভয়াবহ হাশরের ময়দানে যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন রোযাদারগণ আল্লাহর আরশের নিচে স্থানলাভ করবে।

১০. সিয়াম সাধনা মানব মনে খোদাভীতি জাগ্রত করে, সংযম ও আত্নশুদ্ধি লাভে উদ্বুদ্ধ করে এবং মানুষকে কঠোর সাধনায় অভ্যস্ত করে চারিত্রিক দৃঢ়তায় উপনীত করে।

রোযার মাসের মর্যাদা :

রোযার মাস হলো রমাদান মাস। এটি হচ্ছে আরবী বারো মাসের মধ্যে নবম মাস। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সম্মানিত মাস। কুরআন ও হাদীসের আলোকে এটি সম্মানিত মাস হওয়ার পেছনে কতিপয় কারণ রয়েছে। যেমন-

১. কুরআন নাযিলের মাস : পবিত্র রমাদান মাসে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য হেদায়াতের আলোকবর্তিকা কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে- ‘রমযান মাস হলো সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে আল কুরআন। যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট নিদর্শন। আর সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে এ মাসটি পাবে, সে যেন তাতে রোযা রাখে।’(সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৫)।

২. বরকতময় মাস : মাহে রমাদান বরকতময় মাস। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে- ‘হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের নিকট রমযান আসছে। এটি বরকতময় মাস। এ মাসে রোযা রাখা আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর ফরয করে দিয়েছেন। এ মাসে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং দুষ্ট শয়তানকে বন্দী করা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে যার মর্যাদা হাজার মাস অপেক্ষা বেশি। যাকে সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, সে প্রকৃত বঞ্চিত।’ (সুনানে নাসায়ী)।

৩. মাহে রমাদানে ইবাদতের তাৎপর্য অত্যধিক : এ মাসের ইবাদতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল কাজ করল, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরয কাজ করল। আর যে এ মাসে একটি ফরয কাজ করল, সে যেন অন্য মাসের সত্তরটি ফরয কাজ করল।’ (বায়হাকী)।

৪. মাহে রমাদানে বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হয় : রমাদান মাসের আগমনের সাথে সাথে বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে- ‘যখন রমাদান আসে, তখন তার (সম্মানে) রহমতের (বেহেশতের) দরজা খুলে দেয়া হয় এবং দোযখের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শয়তানকে বন্দী করা হয়।’ (সহীহ মুসলিম)।

৫. মাহে রমাদানে ওমরা পালনে হজ্জের সাওয়াব পাওয়া যায় : এ মাসে কোনো বান্দা যদি ওমরা পালন করে, তবে সে হজ্জের সমান সাওয়াব পাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারী মহিলাকে বললেন, রমাদান মাস এলে তুমি ওমরা করবে। কারণ রমাদানের ওমরাতে হজ্জের সমান সাওয়াব দেয়া হয়। (সুনানে নাসায়ী)।

৬. সহনশীলতার মাস : রমাদান মাস রোযাদারকে ধৈর্য ও সহনশীলতার শক্তি যোগায়। এ মাসে সকল প্রকার পানাহার ও সুন্দরী স্ত্রী কাছে থাকা সত্তে¡ও একমাত্র আল্লাহর ভয়ে রোযাদার পানাহার ও সঙ্গম থেকে বিরত থাকে।

৭. মাহে রমাদান ধৈর্যধারণের শক্তি যোগায় : মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রমাদান ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাত।’ ধৈর্য কেবল পারিবারিক ক্ষেত্রেই নয়; বরং সামাজিক পরিমন্ডলেও এক অনন্য মূল্যবোধের সৃষ্টি করে। ফলে সমাজে শান্তি ও ইনসাফের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

৮. ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির মাস : মাহে রমাদানের রোযার মাধ্যমে মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। ধনী ব্যক্তি উপবাসের মাধ্যমে গরিবের দুঃখ ও অনাহারের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। একে অপরের সুখ-দুঃখ উপলব্ধির মধ্য দিয়ে পরস্পরের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়।

রোযার মাসে অন্যকে খাওয়ানো :

রোযার মাস অন্যকে খাওয়ানোর মাস। আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, রোযার মাসে যা খাওয়া হবে তার হিসাব হবে না। এ জন্য এ মাসকে আমরা খাওয়ার মাস বানিয়ে ফেলেছি। অথচ এটি ঠিক নয়; আমাদের চিন্তা করতে হবে কিসে সাওয়াব বেশি। রমাদান মাসে অন্যকে খাওয়ানোর মাঝে অনেক সাওয়াব। হাদীসে দু’ভাবে খাওয়ানোর নির্দেশ রয়েছে। যথাÑ ক. দরিদ্রদেরকে খাওয়ানো। খ. রোযাদারদেরকে ইফতার খাওয়ানো। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে-‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যদি কেউ কোনো রোযাদারকে ইফতার করায়, তাহলে সে উক্ত রোযাদারের সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে। তবে এতে উক্ত রোযাদারের সাওয়াব একটুও কমবে না।’ (তিরমিযী, খণ্ড ৩, হাদীস ১৭১)।

সম্মানীত পাঠক! ইফতার করানো অর্থ আনুষ্ঠানিকতা নয়। দরিদ্র সাহাবী তাবিয়ীগণ নিজের ইফতার প্রতিবেশিকে দিতেন এবং প্রতিবেশীর ইফতার নিজে নিতেন। এতে প্রত্যেকেই ইফতার করানোর সাওয়াব পেলেন। অনেকে নিজের সামান্য ইফতারে একজন মেহমান নিয়ে বসতেন। আমাদের সকলেরই চেষ্টা করা দরকার নিয়মিত নিজেদের খাওয়া থেকে সামান্য কমিয়ে অন্যদেরকে ইফতার করানো। বিশেষতঃ দরিদ্র, কর্মজীবী, রিকশাওয়ালা অনেকেই কষ্ট করে রোযা রাখেন এবং ইফতার করতেও কষ্ট হয়। সাধ্যমত নিজেদের খাওয়া একটু কমিয়ে এদেরকে খাওয়ানো দরকার।

রোযাদারের জন্য পালনীয় বিষয়সমূহ :

রমাদানের ফযিলত ও মর্যাদা লাভের জন্য রোযাদারকে যেসব বিষয় পালন করতে হবে তা হলো-

১. রোযাদার অতিরিক্ত কথা বলবে না।

২. অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ বর্জন করবে।

৩. কারো সাথে ঝগড়া-ফাসাদ করবে না। কেউ ঝগড়া করতে আসলে (আমি রোযাদার) বলে তাকে বিদায় দেবে।

৪. বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত ও যিকির-আযকার করবে।

৫. মিথ্যা কথা বলবে না।

৬. কারো সমালোচনায় লিপ্ত হবে না।

৭. রোযার হক যথাযথভাবে আদায় করবে।

৮. স্ত্রীর সাথে যৌনালাপ থেকে বিরত থাকবে।

৯. অশ্লীল ও অশালীন ছবি-চিত্র দেখা থেকে বিরত থাকবে।

১০. মুখ দিয়ে কোনো কিছুর স্বাদ গ্রহণ করবে না।

১১. গরম বা রোদের কারণে বারবার কুলি করা যাবে না।

১২. অধিক উষ্ণতার কারণে গায়ে ভেজা কাপড় জড়িয়ে রাখা যাবে না।

১৩. বেশি বেশি দান-সাদকাহ করতে হবে।

১৪. রোযাদারের জন্য শরীয়ত নির্দেশিত সকল অবৈধ কাজ এড়িয়ে চলতে হবে।

১৫. যথা সময়ে সাহরী ও ইফতার গ্রহণ করতে হবে, ইত্যাদি।

রোযা যেসব কারণে ভেঙ্গে যায় :

রোযাদারকে জানতে হবে কী কারণে তার অতি কষ্টের রোযা ভেঙ্গে যায়। রোযা ভেঙ্গে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। তম্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কতিপয় কারণ হচ্ছে-

১. ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু পানাহার করা।

২. স্ত্রীসহবাস করা।

৩. স্ত্রী চুম্বন দ্বারা বীর্যপাত হওয়া।

৪. ইচ্ছা করে মুখভর্তি বমি করা।

৫. পাথর, লোহার টুকরা বা ফলের আঁটি ইত্যাদি গিলে ফেলা।

৬. ইচ্ছাকৃতভাবে গুহ্যদ্বার বা যৌনপথ দিয়ে যৌন সম্ভোগ করা।

৭. ইচ্ছাপূর্বক এমন জিনিস পানাহার করা, যা খাদ্য বা ওষুধরূপে ব্যবহার হয়।

৮. ঢুস  নেয়া।

৯. কান বা নাকের ভিতর ওষুধ দেয়া।

১০. ধূমপান, লোবান এবং হুক্কা ইত্যাদির ধোঁয়া শুকলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যায়।

উপসংহার :

রোযার সার্বিক গুরুত্ব অপরিসীম। এর মাধ্যমে মানুষের মাঝে আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষ বিভিন্ন পাপাচার থেকে দূরে থেকে সৎকাজের প্রতি ধাবিত হয়। সুতরাং আমাদের প্রত্যেকের উচিত, রোযার এ মহান শিক্ষাকে উপলব্ধি করা। তাই রোযার প্রতি সকলেরই যত্নবান হওয়া অপরিহার্য।

লেখক : মোঃ মোহিব্বুল্লাহ আজাদ

মুহাদ্দিস, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ

ই-মেইল : mmazad1973@gmail.com

Related Posts