দারসুল হাদীস

ঈমানের প্রকৃত স্বাদ

عنِ الْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ رضي الله عنه أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُول

ذَاقَ طَعْمَ الإِيمَانِ، مَنْ رَضِيَ بِالله رَبًّا، وَبِالإِسْلامَ دِيناً، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولاً. رواه البخارى و مسلم

সরল বঙ্গানুবাদ :

হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিব রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে  বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলাকে রব, ইসলামকে জীবনবিধান ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসেবে মনে প্রাণে গ্রহণ করে সন্তুষ্ট হয়েছেন, তিনি ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

রাবী পরিচিতি :

আলোচ্য হাদীসটির রাবী বা বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিব রাদিআল্লাহু আনহু। নিম্মে তাঁর পরিচিতি তুলে ধরা হলো-

১. নাম ও পরিচয় : তাঁর নাম আব্বাস, উপনাম আবুল ফজল। পিতা আবদুল মুত্তালিব, মাতা নাতিলা, মতান্তরে নাসিলা বিনতু খাব্বাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা। তবে দু’জন ছিলেন প্রায় সমবয়সী। ঐতিহাসিকদের ধারণা, সম্ভবতঃ তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই বা তিন বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জাহিলী যুগে তিনি ছিলেন কুরাইশদের একজন প্রভাবশালী নেতা। পুরুষানুক্রমে খানায়ে কা’বার রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব পালন করেন।

২. মহানবীকে সহযোগিতা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত লাভ করার পর মক্কায় প্রকাশ্যে তাওহীদের দাওয়াত দিতে লাগলে হযরত আব্বাস যদিও তখনো প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবে তিনি এ দাওয়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। ৭২ জন মদীনাবাসী আনসারদের নিয়ে আকাবার বায়াতের অনুষ্ঠান চলছিল নিশীথ রাতে, হজের মৌসুমে ও মুজদালিফার পাহাড়ে। সে সময় খঞ্জর হাতে সাহসী ব্যক্তি আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। ঈমান না এনেও তিনি ঐতিহাসিক এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

৩. ইসলাম গ্রহন : মক্কার কুরাইশদের চাপে তিনি বাধ্য হয়ে বদরের যুদ্ধে অংশ নেন ও মুশরিকদের সাথে বন্দী হয়ে মদীনায় আসেন। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। হযরতের চাচা আব্বাস মুক্তিপণের এত বেশি অর্থ প্রদানে অক্ষমতা প্রকাশ করলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আপনি উম্মুল ফজলের নিকট যে অর্থ ও স্বর্ণ রেখে এসেছেন তা থেকে মুক্তিপণের অর্থ পরিশোধ করুন। বিম্ময়ের সাথে হযরত আব্বাস বলে উঠলেন, আল্লাহর শপথ, উম্মুল ফজলের নিকট গচ্ছিত অর্থের বিষয় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি ঘোষণা দিচ্ছি, “নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।” এ কথা বলে তিনি ইসলাম গ্রহন পূর্বক মুসলমান হয়ে যান।

৪. মদীনায় হিজরত : তিনি মক্কায় থাকা অবস্থায় কাফেরদের গতিবিধি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করতেন ও নির্যাতিত মুসলমানদের যথাসাধ্য আশ্রয় দিতেন। মক্কা বিজয়ের কিছু দিন পর তিনি সপরিবারে হিজরত করে মদীনায় চলে আসেন।

৫. যুদ্ধে অংশগ্রহন : তিনি সর্বপ্রথম মক্কা বিজয়ের যুদ্ধে অংশ নেন। হোনায়নের যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে একটি বাহনে আরোহী ছিলেন। হাওায়াজীন গোত্রের তীরন্দাজদের প্রচন্ড আক্রমণের মুখে মুসলমানরা বিক্ষিপ্ত হয়ে দিগি¦দিক ছুটে যেতে থাকেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচা আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুকে কঠিনভাবে আওয়াজ দেয়ার নির্দেশ দিলে তিনি গর্জন করে বলতে থাকেন : “আইনা আসহাবুস সুমরা” তীরন্দাজরা কোথায় ? তার গর্জনে যুদ্ধের গতি বদলে যায়। সবাই ফিরে এসে বিরোধীদের উপর আবারো আক্রমন চালিয়ে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

৬. ইন্তেকাল : হযরত আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু ৩২ হিজরির রজব মাসে ৮৮ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। হযরত উসমান রাদিআল্লাহু আনহু তাঁর জানাজার ইমামতি করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু তাঁর সম্মানিত পিতার লাশ কবরে রাখেন। মদীনা শরীফের জান্নাতুল বাকীর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

হাদীসের বিষয়বস্তু :

মহান আল্লাহকে রব, ইসলামকে জীবনবিধান আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসেবে পেয়ে যিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং পরিতৃপ্তি লাভ করেছেন, তিনিই ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছেন। আর যিনি ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছেন তার কাছে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস সবই তুচ্ছ হয়ে দাড়িয়েছে। ঈমানের সাথে ঈমানের পথে থাকাই তার কাছে আনন্দের বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে এ পথে যতই বিপদ-মুসিবত আসুক না কেন তা তাকে বিন্দুমাত্রও বিচলিত করছেনা।

হাদীসের ব্যাখ্যা : 

হাদীসে ‘ঈমানের প্রকৃত স্বাদ’ প্রাপ্তির বিষয়ে বলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ‘ঈমানের প্রকৃত স্বাদ’ বলতে আমরা কী বুঝি? এর জবাব হচ্ছে-

একজন ব্যক্তির চূড়ান্ত সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করে তার ঈমানের ওপর ভিত্তি করে। ঈমান যদি তার খাঁটি হয় তাহলে সফলতা সুনিশ্চিত আর ঈমান যদি তার ভেজালযুক্ত হয় তাহলে ব্যর্থতা অনিবার্য। যে ঈমান ব্যক্তিকে দুনিয়াদার হতে বারণ করে, আল্লাহর পথে একনিষ্ঠ হতে শেখায়, আল্লাহর রাহে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করার প্রেরণা যোগায়, আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের পথে দৃঢ়ভাবে আটকে রাখে, মহাপ্রভূর সান্নিধ্য অর্জনের লক্ষ্যে সদা নিয়োজিত রাখে এবং ঈমানের রাস্তায় কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রমে বিন্দুমাত্রও পরোয়া করেনা; এমন ঈমানের অধিকারী ব্যক্তিই ঈমানের প্রকৃত স্বাদ গ্রহন করতে পারে।

ইসলামের ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, ঈমানের কারনে জ্বলন্ত কয়লার ওপর জীবন্ত বেলালকে শুইয়ে পাথর চাপা দেয়া হয়েছে। শরীরের চর্বি গলে গলে কয়লা দেহে ঢুকে পড়েছে, রক্ত ও চর্বিতে আগুন নিভে গিয়েছে। সে মর্মান্তিক মুহুর্তেও বেলাল রা. ঈমান থেকে এক তিল পরিমাণ দূরে সরেননি। অচেতন অবস্থায় তিনি অস্পষ্ট স্বরে বারবার উচ্চারণ করছিলেন, ‘আহাদুন-আহাদ’, ‘আহাদুন-আহাদ’। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা সাহাবী ও পরবর্তীদের জীবনে ঘটেছে। এতদসত্বেও তারা ঈমানের মধ্যে কী রহস্যজনক এক মজা খুঁজে পেয়েছিলেন; কোনো যুলুম-নির্যাতন বা অসহ্য কোন যাতনা তাদেরকে ঈমানের স্বাদ আস্বাদনে এক মুহূর্তের জন্যও বিরত রাখতে পারেনি। ঈমানের ওপর তাদের দৃঢ়তা পৃথিবীর সকল আশ্চর্যকে হার মানায়, সকল হৃদয়কে হতবাক করে, সকল জবানকে ভাষাহীন করে দেয়। হাদীসের ভাষায় এর নামই ঈমানের স্বাদ।

আমরা যারা নিজেদেরকে ঈমানদার বলে ঘোষণা দিচ্ছি আমরা কি তাদের মতো ঈমানের স্বাদ ও মজা পেয়েছি? আল্লাহ তা‘আলা তাদের মতো ঈমান আনার আহ্বান জানিয়ে ইরশাদ করেন-

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ ۗ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَٰكِن لَّا يَعْلَمُونَ

“যখন তাদেরকে বলা হলো, আর সব লোক যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সে সব লোকের মতো (ত্যাগ কুরবানির সাথে) ঈমান আনয়ন করো। তারা বলে আমরা কি বোকাদের মতো ঈমান আনব? হায়, এরা যে প্রকৃতপক্ষে বোকা সে ব্যাপারে তারা অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত।” [সূরা বাকারা : ১৩]

সুতরাং আমাদেরকে তাদের মতোই ঈমান আনতে হবে, আল্লাহ তা‘আলা যাদের ঈমান কবুল করেছেন। মুখে ঈমানের বুলি উচ্চারণের নাম প্রকৃত ঈমান নয়। ঈমানের পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে অর্জিত শক্তির নাম ঈমান। আমাদেরকে সে লোকদের মত ঈমান আনতে হবে যাদেরকে উত্তপ্ত আগুনে নিক্ষেপ করার পরও ঈমান থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি, মাথা করাত দিয়ে চিরে দ্বিখন্ডিত করার পরও ঈমান থেকে ক্ষনিকের জন্যও টলেননি, দেহ থেকে শির বিচ্ছিন্ন করার পরও ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন হননি, দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হলেও চুল পরিমাণ বিশ্বাসও যারা ভঙ্গ করেননি।

আলোচ্য হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, ঐ ঈমান কিভাবে হাসিল করা সম্ভব। তিনি বলেছেন, সে দুর্লব ঈমান লাভের রহস্যপূর্ণ ও স্বাদ গ্রহণের তিনটি শর্ত রয়েছে। শর্ত তিনটি হচ্ছে-

১. প্রথম শর্ত : জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলাকে একমাত্র ‘রব’ হিসেবে মেনে নেয়া। এ ‘রব’ বলতে কী বোঝায়? ‘রব’ শব্দটি পবিত্র কুরআনে অনেকগুলো অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন-

ক.  পালনকর্তা অর্থে : এ অর্থে কুরআনে এসেছে-

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

“প্রশংসা শুধু আল্লাহ তা‘আলার জন্য যিনি সারা জাহানের পালনকর্তা।” [সূরা ফাতিহা : ১]

খ. মালিক ও মনিব অর্থে : এ অর্থে কুরআনে এসেছে-

هُوَ رَبُّكُمْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

“তিনি তোমাদের মালিক ও মনিব। তাঁরই নিকট তোমাদের ফিরে যেতে হবে।” [সূরা হুদ : ৩৪]

গ. আনুগত্যের হকদার অর্থে : এ অর্থে কুরআনে এসেছে-

وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ

“তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও আনুগত্যের হকদার বানাবে না।” [সূরা আলে ইমরান : ৬৪]

ঘ. জিম্মাদার ও তত্ত্বাবধায়ক অর্থে : এ অর্থে কুরআনে এসছে-

قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ

“ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেন, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই! তিনি আমার রব তথা জিম্মাদার ও তত্ত্বাবধায়ক যিনি আমাকে ভালো রেখেছেন।” [সূরা ইউসুফ : ২৩]

‘রব’ এর আরো অনেক অর্থ রয়েছে। এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসর হওয়ায় সেদিকে না গিয়ে আমরা একথা বলতে পারি যে, রব হিসেবে আল্লাহ তা‘আলাকে গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে, একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস ও স্বীকার করা যে, আল্লাহই একমাত্র প্রতিপালক, মালিক, মনিব, প্রভু, তত্ত্বাবধানকারী ও একমাত্র আনুগত্য পাওয়ার হকদার। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।

২. দ্বিতীয় শর্ত : ইসলামকে আনুষ্ঠানিক একটি সাধারণ দ্বীন বা ধর্ম হিসেবে গ্রহণ না করে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে মেনে নিয়ে এতে তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট থাকা। কুরআনুল কারীমে এ দ্বীন শব্দটি অনেকগুলো গুরত্বপূর্ণ অর্থে  ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন-

ক. জীবনবিধান অর্থে : এ অর্থে কুরআনে এসেছে-

أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ

“তারা কি আল্লাহ তা‘আলার তৈরি বিধান ছাড়া অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা তালাশ করছে, অথচ আকাশ ও জমিনের সবকিছু ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আল্লাহ তা‘আলার কানুনের নিকট আত্মসমর্পণ করছে এবং তারই নিকট সবাইকে ফিরে যেতে হবে।” [সূরা আলে ইমরান : ৮৩]

খ. আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ অর্থে : এ অর্থে কুরআনে এসেছে-

أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ

“সাবধান! আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য।” [সূরা জুমার : ৩]

গ. সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব অর্থে : এ অর্থে কুরআনে এসেছে-

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ

“হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহ ছাড়া কারো নেই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর ব্যতীত কারো দাসত্ব করা যাবে না। আর এটাই সঠিক দ্বীন।” [সূরা ইউসুফ : ৪০]

ঘ. প্রতিফল দিবস তথা সফলতা ও ব্যর্থতার চূড়ান্ত ফায়সালা অর্থে : এ অর্থে কুরআনে এসেছে-

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ

“যিনি প্রতিফল দিবসের মালিক।” [সূরা ফাতিহা : ৩]

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, ‘দ্বীন’ শব্দের  অথের্র মধ্যে ব্যাপকতা রয়েছে। এর মধ্যে নিহিত রয়েছে, মানুষের জীবন চলার বিধান, সার্বভৌমত্ব, আনুগত্য, উপাসনা ও বন্দেগির সকল পর্যায়। আর আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য এ দ্বীন হচ্ছে শুধু একটি। আর তা হলো ইসলাম। ইসলাম এক ব্যাপক ও বিস্তৃত বিষয়ের নাম। এটা মানবজীবনের সকল দিক ও বিভাগকে শামিল করে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, তামুদ্দনিক এবং বৈশ্বিক সর্বত্র এর আওতাভূক্ত।

৩. তৃতীয় শর্ত : মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী ও রাসূল হিসেবে পেয়ে পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট থাকা। এর অর্থ হচ্ছে, তাঁর আনীত আদর্শকেই একমাত্র পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত জীবন চলার পথ হিসেবে গ্রহণ করা। যারা গ্রহন করবে তারা ঈমানের পরিপূর্ণ স্বাদ অনুভব করবে। আমরা জানি যে, সকল নবী ও রাসূলকে একটি নির্দিষ্ট জনবসতির জন্য পাঠানো হয়েছিল। এর বাইরে তাদের নবুওয়াতের দাওয়াত প্রদানের সুযোগ ও প্রয়োজন ছিল না। নবুওয়াতের ইতিহাসের একমাত্র ব্যতিক্রম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি কোন এলাকার বা আঞ্চলিক নবী নন, তিনি নাবিয়্যুল আলামীন তথা বিশ্বনবী। তার নবুওয়াতের কোন চিহ্নিত সীমানা নেই ও নেই কোন নির্দিষ্ট মেয়াদ। তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য এবং অনাদিকালের জন্য রাসূল। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে-

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا

“হে রাসূল আপনি বলুন! ওহে মানবমন্ডলী, আমি তোমাদের সকলের জন্যে রাসূল হয়ে এসেছি।” [সূরা আরাফ : ১৫৮]

হাদীসের শিক্ষা :

এ হাদীসের অনেকগুলো শিক্ষা রয়েছে। তম্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শিক্ষা হচ্ছে-

১. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর রবুবিয়াতকে মেনে নিতে হবে এবং আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

২. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বীন হিসেবে ইসলামকে মেনে চলার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে এবং পৃথিবীর অন্যসব চাকচিক্যপূর্ণ মিথ্যা-বানোয়াট ও মানব রচিত সকল মত ও পথ থেকে বিরত থাকতে হবে।

৩. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত আদর্শকেই একমাত্র পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত জীবন চলার পথ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

আহবান :

সুতরাং ঈমানের স্বাদ পেতে হলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তথা তাঁর আনীত আদর্শকে একমাত্র পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত জীবন চলার পথ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমেই ঈমানের স্বাদ পেয়ে দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তি পাওয়া যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে ঈমানের স্বাদ উপভোগ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।।

লিখেছেন :

মো: মোহিব্বুল্লাহ আজাদ, লেখক, গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবীদ।

ই-মেইল- mmazad1973@gmail.com

Related Posts