দারসুল কুরআন

রিজিকের মালিক আল্লাহ

সূরা  :  হুদ

আয়াত  :  ০৬

اعوذ بالله من الشيطان الرجيم – بسم الله الرحمن الرحيم

وَمَا مِن دَآبَّةٖ فِي ٱلۡأَرۡضِ إِلَّا عَلَى ٱللَّهِ رِزۡقُهَا وَيَعۡلَمُ مُسۡتَقَرَّهَا وَمُسۡتَوۡدَعَهَاۚ كُلّٞ فِي كِتَٰبٖ مُّبِينٖ

সরল বঙ্গানুবাদ :

“পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। তাদের স্থায়ী এবং অস্থায়ী অবস্থানস্থল সম্পর্কে তিনি অবহিত। সবকিছুই একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লেখা আছে।” (সূরা হুদ : ৬)

শানে নুযূল :

মানুষের প্রতি এক বিশেষ অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা উল্লেখিত আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। এতে তিনি বর্ণনা করেছেন যে, মানুষের আহার্য-পানীয় ইত্যাদি রিজিকের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেছেন। শুধু মানুষেরই নয়, প্রথিবীতে বিচরণশীল প্রতিটি প্রাণী যেমন হিংস্র জন্তু, পক্ষীকুল, গুহাবাসী সরীসৃপ, পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গ, সামুদ্রিক প্রাণী প্রভৃতি যে যেখানেই অবস্থান করুক বা চলাচল করুক না কেন, সেখানেই তার রিজিক পৌঁছতে থাকবে। এমতাবস্থায় আল্লাহর ক্ষমতা ও ব্যাপকতার কোনো কিছু গোপন করার জন্য কাফিরদের অপকৌশল ও ব্যর্থপ্রয়াস বোকামি এবং মূর্খতা বৈ আর কিছুই নয়। (তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআন)

বিষয়বস্তু :

পৃথিবীর জল ও স্থলভাগের সর্বত্রে বসবাসরত প্রাণীকুলের রিজিকের জিম্মাদারিত্ব আল্লাহর উপর ন্যাস্ত। সুতরাং রিজিক নিয়ে আমাদের ব্যতিব্যস্ত ও পেরেশান হওয়ার কিছু নেই। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। আমাদের কাজ হচ্ছে হাত-পা গুটিয়ে বসে না থেকে এর জন্য র্নিধারিত উপায়-উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে তা অর্জনের চেষ্টা করা। আর এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া যে, দুনিয়ার জন্য আমরা যত কিছুই করি না কেন, এ দুনিয়া শেষ ঠিকানা নয়। যত উপার্জনই করি না কেন, তা স্থায়ী কোনো সম্পদ নয়। সকলকে একদিন এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। হিসাবের জন্য আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

ব্যাখ্যা :

উল্লেখিত আয়াতটিতে মহান আল্লাহ সকল প্রাণীর রিজিক যে তাঁরই দায়িত্বে রয়েছে সে কথা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। সমগ্র পৃথিবীর জলে-স্থলে, পাহাড়-পর্বতে, সাগর-মহাসাগরে, বন-জঙ্গলে, গুহা-গর্তে এভাবে  যতস্থানে প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে, তাদের সকলের রিজিকের ব্যবস্থা একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। কোন জীব কোথায় থাকে, কোথায় চলাচল করে, কোথায় আশ্রয় গ্রহণ করে, কোথায় জন্মগ্রহণ করে, কোথায় কী করে, সবশেষে কোথায় মৃত্যুবরণ করে, সব কিছুই মহান আল্লাহর কিতাবে লেখা রয়েছে। (তাফসির ইবন কাসির) ।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন-

وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُم ۚ مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍ ۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ

‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল কোনো প্রাণী এবং বাতাসে ডানা বিস্তার করে উড়ে চলা কোনো পাখিকেই দেখ না কেন, এরা সবাই তোমাদের মতই বিভিন্ন শ্রেণী। তাদের ভাগ্যলিপিতে কোনো কিছু লিখতে আমি বাদ দেইনি। তারপর তাদের সবাইকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।’ (সূরা আল-আনআম : ৩৮)

মহান আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কিছুই হয় না বা তাঁর অজ্ঞাতসারে কোনো কিছুই ঘটে না; সে ব্যাপারে কুরআনুল কারিমের অন্যত্র বলা হয়েছে-

وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ۚ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ۚ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ

‘তাঁরই কাছে আছে অদৃশ্যের চাবি, তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না। জলে-স্থলে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন । তাঁর অজ্ঞাতসারে গাছের একটি পাতাও পড়ে না। মৃত্তিকার অন্ধকার প্রদেশে এমন একটি শস্যকণাও নেই যে সম্পর্কে তিনি অবগত নন। শুষ্ক ও আর্দ্র সবকিছুই একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিখিত আছে।’ (সূরা আল আনআম : ৫৯)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আল্লাহ এমন সূক্ষ্ণজ্ঞানী যে, প্রত্যেকটি পাখির বাসা ও প্রত্যেকটি পোকা-মাকড়ের গর্ত তাঁর জানা এবং তাদের প্রত্যেকের কাছে তিনি তাদের জীবনোপকরণ পাঠিয়ে দিচ্ছেন, আর প্রত্যেকটি প্রাণী কোথায় থাকে এবং কোথায় মৃত্যুবরণ করে প্রতি মুহুর্তে যিনি এ খবর রাখেন, তাঁর সম্পর্কে যদি তোমরা এ ধারণা করে থাকো যে, এভাবে মুখ লুকিয়ে অথবা কানে আঙুল চেপে কিংবা চোখ বন্ধ করে তাঁর পাকড়াও থেকে রক্ষা পাবে তাহলে তোমরা বড়োই বোকা। সত্যের আহবনকারীকে দেখে তোমরা মুখ লুকালে তাতে লাভ কী? এর ফলে কি তোমরা আল্লাহর কাছ থেকেও নিজেদের গোপন করতে পারবে ? আল্লাহ কি দেখছেন না, এক ব্যক্তি তোমাদের সত্যের সাথে পরিচিত করাবার দায়িত্ব পালন করছেন আর তোমরা তার কথা যাতে তোমাদের কানে না পৌঁছে সেজন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছো।

এ আয়াতের প্রাসঙ্গিকতায় বলা যায়, মানুষ রিজিকের চিন্তায় হর-হামেশা মগ্ন থাকে। কাঙ্ক্ষিত রিজিক না পেলে মন খারাপ করে এবং বিষণ্নতায় ভোগে। অথচ ধৈর্যধারণ পূর্বক প্রচেষ্টা করেনা এবং রিজিকের মালিক আল্লাহ তায়ালার নিকট রিজিক কামনা করেনা। অথচ গোটা পৃথিবীর সকল প্রাণীর রিজিকের জিম্মাদারিত্ব একমাত্র তাঁরই হাতে। নির্ধারিত নিয়ম ও পন্থায় পরিশ্রম করার পাশাপাশি তাঁর নিকট রিজিক চাইলেই  তা পাওয়া যায়। তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কিছু পালনীয় বিষয় রয়েছে। এখানে আমরা তা  আলোচনা করার পূর্বে প্রথমে  জানবো, রিজিক কাকে বলে?

‘রিজিক’ এর কয়েকটি সংজ্ঞা রয়েছে। যথা- (ক) মহান আল্লাহ তার সৃষ্টি জীবের প্রয়োজনে যেসকল বস্তুর ব্যবস্থা করেন, তারপর সৃষ্টিজীব তার দ্বারা উপকৃত হয়, তা-ই রিজিক। সুতরাং সকল সৃষ্টিই নিজ নিজ রিজিক গ্রহণ করে থাকে। (শারহুল মাকাসিদ : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩৫) । (খ) আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য যে সকল বস্তুর ব্যবস্থা করেন, অনন্তর প্রাণী তা গ্রহণ করে জীবন পরিচালনা করে তা-ই রিজিক। আর তা কখনো কিছু সৃষ্টির জন্য হালাল হয় এবং কখনো কিছু সৃষ্টির জন্য হারাম হয়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আপেক্ষিকভাবে যা হারাম, তা-ও রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, সৃষ্টি বিশেষের জন্য হালাল করা হয়েছে। (গ) কারো কারো মতে, প্রাণী যা ভক্ষণ করে জীবন যাপন করে তাকে রিজিক বলে। তবে এ সংজ্ঞা হতে প্রথমোক্ত সংজ্ঞাটি উত্তম। কেননা, তৃতীয় সংজ্ঞায় রিজিকের সম্বন্ধ আল্লাহ তায়ালার দিকে করা হয়নি। অথচ রিজিক বোঝাতে আল্লাহর প্রতি সম্বন্ধ থাকা বাঞ্চনীয়। (শারহুল আকাইদ : পৃষ্ঠা ৯৫)

তবে ‘রিজিক’ ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। রিজিক বলতে স্বাস্থ্য, সম্পদ, খাদ্য, বুদ্ধি, উপায়-উপকরণ, সময় ইত্যাদি সবই বোঝায়। এমনকি আমাদের জীবনটাও রিজিক। এ সবকিছুই আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ হলেন ‘আর-রাজ্জাক’ তথা রিজিকদাতা। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা যদি কোনো কাজ না করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকি, তাহলে আমাদের রিজিক আসবে কি না? না-কি চেষ্টা করতে হবে? কুরআন ও হাদীসের আলোকে এর জবাব হলো, অবশ্যই রিজিকের সন্ধানে চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহ রিজিক অন্বেষণের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন : তারপর যখন নামায শেষ হয়ে যায় তখন তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তথা রিজিক সন্ধান করো এবং অধিক মাত্রায় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো। আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে। (সূরা আল-জুমুআ : ১০)

মহান আল্লাহ আরো বলেন, তোমাদেরকে আমি ক্ষমতা-ইখতিয়ার সহকারে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তোমাদের জন্য এখানে জীবন ধারণের উপকরণ সরবরাহ করেছি। কিন্তু তোমরা খুব কমই শোকর গুজারি করে থাকো। (সূরা আল আরাফ : ১০)

অধিকাংশ কাজ যার মাধ্যমে রিজিক অর্জন করা যায়, তা আল্লাহ তায়ালা সহজ করেছেন, কঠিন করেননি। তিনি এ ব্যাপারে বলেন-

هُوَ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ ذَلُولٗا فَٱمۡشُواْ فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُواْ مِن رِّزۡقِهِۦۖ وَإِلَيۡهِ ٱلنُّشُورُ

‘তিনিই তো সেই মহান সত্ত্বা! যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা এর পথে প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তাঁর রিজিক থেকে তোমরা আহার কর। আর তাঁর নিকটই পুনরুত্থান।’ (সূরা আল-মুলক, আয়াত : ১৫)

এ আয়াতে একটি কথা স্পষ্ট করা হয়েছে, দুনিয়াতে জীবন পরিচালনার জন্য যত কিছুই করা হোক না কেন, এ দুনিয়া শেষ ঠিকানা নয়। যত উপার্জন হোক না কেন, তা স্থায়ী কোনো সম্পদ নয়। সকলকে অবশ্যই একদিন এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে অবশ্যই তার উপার্জন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহর সামনে এ হিসাব দিতে হবে যে, কোথা থেকে উপার্জন করলে এবং কোথায় ব্যয় করলে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: হতে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন : কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় স্থান থেকে সরবে না। ১.তার জীবনকাল সম্পর্কে, কীভাবে অতিবাহিত করেছে? ২.তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কী কাজে তা ব্যয় করেছে? ৩ ও ৪.তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং কোথায় তা খরচ করেছে এবং ৫. সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল, সে অনুযায়ী কী কী আমল করেছে। (জামে আত-তিরমিজি)

এখন আমরা আলোচনা করবো, কীভাবে রিজিক পাওয়া যায় কিংবা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। রিজিক পাওয়ার জন্য আমাদের কর্তব্য হলো হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এর জন্য র্নিধারিত উপায়-উপকরণ সংগ্রহের চেষ্টা করা। কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কিছু পালনীয় বিষয় রয়েছে। আর তা হচ্ছে-

১. তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা : আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া অবলম্বন করা, তাঁর নির্দেশাবলি পালন ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জন করা। পাশাপাশি আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখা, তাওয়াক্কুল করা এবং রিজিক তালাশে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা অপরিহার্য। কারণ, যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مَخۡرَجٗا وَيَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَحۡتَسِبُۚ وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ بَٰلِغُ أَمۡرِهِۦۚ قَدۡ جَعَلَ ٱللَّهُ لِكُلِّ شَيۡءٖ قَدۡرٗا

‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’ (সূরা আত-তালাক, আয়াত : ২-৩)

মোটকথা, যে আল্লাহকে ভয় করবে এবং আনুগত্য দেখাবে, আল্লাহ তার সকল সংকট দূর করে দেবেন এবং তার কল্পনাতীত স্থান থেকে রিজিকের সংস্থান করে দেবেন। আর যে কেউ তার উদ্দেশ্য হাসিলে একমাত্র আল্লাহর শরণাপন্ন হয় তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। বলাবাহুল্য, এই তাকওয়ার পরিচয় মেলে হালাল উপার্জনে চেষ্টা এবং সন্দেহযুক্ত কামাই বর্জনের মধ্য দিয়ে।

 ২. তওবা ও ইস্তেগফার করা : অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার এবং বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও রিজিক বাড়বে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর অন্যতম নবী ও রাসূল নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনা তুলে ধরে ইরশাদ করেন-

فَقُلۡتُ ٱسۡتَغۡفِرُواْ رَبَّكُمۡ إِنَّهُۥ كَانَ غَفَّارٗا  يُرۡسِلِ ٱلسَّمَآءَ عَلَيۡكُم مِّدۡرَارٗا  وَيُمۡدِدۡكُم بِأَمۡوَٰلٖ وَبَنِينَ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ جَنَّٰتٖ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ أَنۡهَٰرٗا

‘আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল’। (তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলে) ‘তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা’। (সূরা নূহ, আয়াত : ১০-১২)

হাদীসে বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে বলা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ

‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন। সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন।’ (সুনানু আবি দাউদ : ১৫২০; সুনানু ইবনে মাজাহ : ৩৮১৯; তাবরানী : ৬২৯১) 

অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ أَكْثَرَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ

‘যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন। সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।’  (বায়হাকী : ৬৩৬; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৬৭৭ সহীহ সূত্রে বর্ণিত)

 ৩. আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা : আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের হক আদায়ের মাধ্যমেও রিজিক বাড়বে। যেমন- আনাস ইবনে মালেক (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি। তিনি ইরশাদ করেন-

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ

‘যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক সে যেনো তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারী : ৫৯৮৫; মুসলিম : ৪৬৩৯)

 ৪. নবীজীর ওপর দরুদ পড়া : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ পাঠেও রিজিকে প্রশস্ততা আসে। যেমনটি অনুমিত হয় নিম্নোক্ত হাদীস থেকে। হযরত তোফায়েল ইবনে উবাই ইবন কাব (রা) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন-

قُلْتُ يا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّى أُكْثِرُ الصَّلاَةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلاَتِى فَقَالَ « مَا شِئْتَ »قَالَ قُلْتُ الرُّبُعَ. قَالَ « مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ ». قُلْتُ النِّصْفَ. قَالَ « مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ ». قَالَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ. قَالَ « مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ ». قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلاَتِى كُلَّهَا. قَالَ « إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ ». قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صحيح -.

‘আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার প্রতি অধিকহারে দরুদ পড়তে চাই, অতএব আমার দোয়ার মধ্যে আপনার দরুদের জন্য কতটুকু অংশ রাখব? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। হযরত কাব বলেন, আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে যদি তুমি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, অর্ধেক? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে তুমি যদি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। কাব বলেন, আমি বললাম, তাহলে দুই তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে তুমি যদি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, আমার দোয়ার পুরোটা জুড়েই শুধু আপনার দরুদ রাখব। তিনি বললেন, তাহলে তা তোমার ঝামেলা ও প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি ‘হাসান’ সহীহ।) (তিরমিযী : ২৬৪৫; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৬৭৭)

৫. আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা : আল্লাহর রাস্তায় কেউ ব্যয় বা দান করলে তা বিফলে যায় না। সে সম্পদ ফুরায়ও না; বরং তা বাড়বে বৈ কি। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

قُلۡ إِنَّ رَبِّي يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ وَيَقۡدِرُ لَهُۥۚ وَمَآ أَنفَقۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَهُوَ يُخۡلِفُهُۥۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلرَّٰزِقِينَ

‘বলুন, ‘নিশ্চয় আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর জন্য ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই উত্তম রিজিকদাতা।’ (সূরা আস-সাবা’, আয়াত : ৩৯)

৬. বারবার হজ-উমরা করা : হজ ও উমরা পাপ মোচনের পাশাপাশি হজকারী ও উমরাকারীর অভাব-অনটন দূর করে এবং তার সম্পদ বাড়িয়ে দেয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

تَابِعُوا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِى الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَلَيْسَ لِلْحَجَّةِ الْمَبْرُورَةِ ثَوَابٌ إِلاَّ الْجَنَّةُ

‘তোমরা হজ ও উমরা পরপর করতে থাক। কেননা তা অভাব ও গুনাহ দূর করে দেয়, যেমন দূর করে দেয় কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লাকে।’ (তিরমিযী : ৮১৫; নাসাঈ : ২৬৩১)

৭. দুর্বলের প্রতি সদয় ও সদাচার করা : হযরত মুসয়াব ইবন সাদ (রা) যুদ্ধজয়ের পর মনে মনে কল্পনা করলেন, তিনি বোধ হয় তাঁর বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্য হেতু অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি মর্যাদাবান। সেই প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلاَّ بِضُعَفَائِكُمْ

‘তোমাদের মধ্যে থাকা দুর্বলদের কারণে কেবল তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিজিক প্রদান করা হয়।’ (বুখারী : ২৮৯৬)

৮. ঝঞ্ঝাটমুক্ত ইবাদত : আল্লাহর ইবাদতের জন্য ঝামেলামুক্ত হলে এর মাধ্যমেও অভাব দূর হয় এবং প্রাচুর্য লাভ হয়। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে হযরত আবু হোরায়রা (রা) কর্তৃক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِى أَمْلأْ صَدْرَكَ غِنًى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ وَإِلاَّ تَفْعَلْ مَلأْتُ يَدَيْكَ شُغْلاً وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ

‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য তুমি ঝামেলামুক্ত হও। তাহলে আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র্য ঘুচিয়ে দেব। আর যদি তা না কর, তবে তোমার হাত ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব দূর করব না।’ (তিরমিযী : ২৬৫৪; মুসনাদ আহমদ : ৮৬৮১; ইবনে মাজাহ : ৪১০৭)

 ৯. আল্লাহর পথে হিজরত করা : আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে হিজরত তথা স্বদেশ ত্যাগ করলে এর মাধ্যমেও রিজিকে প্রশস্ততা ঘটে। যেমনটি অনুধাবিত হয় নিচের আয়াত থেকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَن يُهَاجِرۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ يَجِدۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ مُرَٰغَمٗا كَثِيرٗا وَسَعَةٗۚ وَمَن يَخۡرُجۡ مِنۢ بَيۡتِهِۦ مُهَاجِرًا إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ يُدۡرِكۡهُ ٱلۡمَوۡتُ فَقَدۡ وَقَعَ أَجۡرُهُۥ عَلَى ٱللَّهِۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا

‘আর যে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করবে, সে জমিনে বহু আশ্রয়ের জায়গা ও সচ্ছলতা পাবে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে মুহাজির হয়ে নিজ ঘর থেকে বের হয় তারপর তাকে মৃত্যু পেয়ে বসে, তাহলে তার প্রতিদান আল্লাহর উপর অবধারিত হয়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১০০)

 এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস প্রমুখ সাহাবী বলেন, স্বচ্ছলতা অর্থ রিজিকে প্রশস্ততা।

১০. আল্লাহর পথে জিহাদ : একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জিহাদেও সম্পদের ব্যপ্তি ঘটে। গনিমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মাধ্যমে সংসারে প্রাচুর্য আসে। যেমন ইবনে ওমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلِّ رُمْحِي

‘আর আমার রিজিক রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে।’  (মুসনাদ আহমদ : ৫৬৬৭; বায়হাকী : ১১৫৪; শুয়াবুল ঈমান : ১৯৭৮৩)

 ১১. আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা : সাধারণভাবে আল্লাহ যে রিজিক ও নেয়ামতরাজি দান করেছেন তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া করা এবং তাঁর স্তুতি গাওয়া রিজিক বৃদ্ধির কারণ। কারণ, শুকরিয়ার ফলে নেয়ামত বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَإِذۡ تَأَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِن شَكَرۡتُمۡ لَأَزِيدَنَّكُمۡۖ وَلَئِن كَفَرۡتُمۡ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيد

‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড়ো কঠিন।’ (সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ০৭)

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা শুকরিয়ার বদৌলতে নেয়ামত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আর বলাবাহুল্য আল্লাহর বাড়ানোর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।

১২. বিয়ে করা : আজকাল মানুষের দুনিয়ার প্রাচুর্য ও বিলাসের প্রতি আসক্তি এত বেশি বেড়েছে, তারা প্রচুর অর্থ নেই এ যুক্তিতে প্রয়োজন সত্ত্বেও বিয়ে বিলম্বিত করার পক্ষে রায় দেন। তাদের কাছে আশ্চর্য লাগতে পারে এ কথা যে, বিয়ের মাধ্যমেও মানুষের সংসারে প্রাচুর্য আসে। কারণ, সংসারে নতুন যে কেউ যুক্ত হয়, সে তো তার জন্য বরাদ্দ রিজিক নিয়েই আসে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَأَنكِحُواْ ٱلۡأَيَٰمَىٰ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰلِحِينَ مِنۡ عِبَادِكُمۡ وَإِمَآئِكُمۡۚ إِن يَكُونُواْ فُقَرَآءَ يُغۡنِهِمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٞ

‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩২)

হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) বলতেন, ওই ব্যক্তির ব্যাপার বিস্ময়কর, যে বিয়ের মধ্যে প্রাচুর্য খোঁজে না। কারণ স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।’

১৩. আল্লাহর কাছে দোয়া করা : রিজিক অর্জনে এবং অভাব দূরীকরণে প্রয়োজন আল্লাহর কাছে দোয়া করা। কারণ, তিনি প্রার্থনা কবুল করেন। আর আল্লাহ তায়ালাই রিজিকদাতা এবং তিনি অসীম ক্ষমতাবান। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ

‘আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।’(সূরা আল-মু‘মিন, আয়াত : ৬০)

এ আয়াতে আল্লাহ তাঁর কাছে দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর তিনি তা কবুলের জিম্মাদারি নিয়েছেন। যে পর্যন্ত না তা কবুলের পথে কোনো অন্তরায় না হয়।  যেমন ওয়াজিব তরক করা, হারাম কাজে জড়ানো, হারাম আহার গ্রহণ বা খারাপ পোশাক-পরিচ্ছদ পরা ইত্যাদি। আল্লাহর কাছে দোয়ায় বলা যেতে পারে- ‘হে রিজিকদাতা! আমাকে রিজিক দান করুন। আপনি সর্বোত্তম রিজিকদাতা। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পবিত্র ও সুপ্রশস্ত রিজিক চাই। হে ওই সত্তা, দানের ঢল সত্ত্বেও যার ভান্ডারে কমতি হয় না। হে আল্লাহ! আমাকে আপনি আপনার হালাল দিয়ে আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দিন আর আপনার দয়া দিয়ে আপনি ছাড়া অন্যদের থেকে যথেষ্ট হয়ে যান। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যে রিজিক দিয়েছেন তা দিয়েই সন্তুষ্ট বানিয়ে দিন। আর যা আমাকে দিয়েছেন তাতে বরকত দিন।’

অভাবকালে মানুষের কাছে হাত না পেতে আল্লাহর শরণাপন্ন হলে এবং তাঁর কাছেই প্রাচুর্য চাইলে অবশ্যই তার অভাব মোচন হবে এবং রিজিক বাড়ানো হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা) কর্তৃক বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِالنَّاسِ لَمْ تُسَدَّ فَاقَتُهُ وَمَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِاللَّهِ فَيُوشِكُ اللَّهُ لَهُ بِرِزْقٍ عَاجِلٍ أَوْ آجِلٍ

‘যে ব্যক্তি অভাবে পতিত হয়, অতপর তা সে মানুষের কাছে সোপর্দ করে (অভাব দূরীকরণে মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়), তার অভাব মোচন করা হয় না। পক্ষান্তরে যে অভাবে পতিত হয়ে এর প্রতিকারে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হয় তবে অবিলম্বে আল্লাহ তাকে তরিৎ বা ধীরে রিজিক দেবেন।  (তিরমিযী : ২৮৯৬; মুসনাদ আহমদ : ৪২১৮)

১৪. গুনাহ ত্যাগ করা : গুনাহ ত্যাগ করা, আল্লাহর দ্বীনের ওপর অটল থাকা এবং নেকীর কাজ করা, এসবের মাধ্যমেও রিজিকের রাস্তা প্রশস্ত হয়। যেমন পূর্বোক্ত আয়াতগুলো থেকে অনুমান করা যায়। তবে সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা দুনিয়াতে চিরদিন থাকার জন্য আসিনি। তাই দুনিয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে উচিত হবে আখেরাতকে অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দেয়া। আমাদের এহেন অবস্থা দেখে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

بَلۡ تُؤۡثِرُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا  وَٱلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓ

‘বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছ। অথচ আখেরাত সর্বোত্তম ও স্থায়ী।’ (সূরা আল-আলা, আয়াত : ১৬-১৭)

আর পরকালের মুক্তি ও চিরশান্তিই যার প্রধান লক্ষ্য তার উচিত হবে রিজিকের জন্য হাহাকার না করে অল্পে তুষ্ট হতে চেষ্টা করা। যেমন : হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবন আস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ وَرُزِقَ كَفَافًا وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ

‘ওই ব্যক্তি প্রকৃত সফল যে ইসলাম গ্রহণ করেছে আর তাকে জীবন ধারণে (অভাবও নয়; বিলাসও নয়) পর্যাপ্ত পরিমাণ রিজিক দেয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে তুষ্টও করেছেন। (মুসলিম : ২৪৭৩; তিরমিযী : ২৩৪৮; আহমদ : ৬৫৭২)

পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের এসব উপায়-উপকরণ যোগাড় করে রিজিক তথা হালাল উপার্জনে উদ্যোগী ও সফল হবার তাওফীক দান করেন। তিনি যেন আপনাদের রিজিক ও উপার্জনে প্রশস্ততা দান করেন। আমীন।

আয়াতের শিক্ষা :

উল্লেখিত আয়াতের শিক্ষা হচ্ছে-

১. রিজিকের চিন্তায় অস্থীর না হয়ে তা প্রাপ্তির জন্য উপায় অবলম্বন পূর্বক চেষ্টা-সাধনা করতে হবে।

২. রিজিক চাইতে হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার কাছে; অন্য কারো কাছে নয়।

৩. মুমিন হিসেবে একথা বিশ্বাস করতে হবে যে, রিজিক দেয়ার মালিক আল্লাহ আবার রিজিক চিনিয়ে নেয়ার মালিকও আল্লাহ। রিজিকের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহরই হাতে।

৪. কোনো প্রয়োজন কিংবা চাহিদা পূরণ হতে দেরি হলেও ধৈর্যধারণ করতে হবে।

৫. হালাল রিজিক অন্বেষণের পথ যত কঠিনই হোক না কেন সেপথেই পরিশ্রম করতে হবে আর হারাম রিজিক অন্বেষণের পথ যত সহজই হোক না কেন তা পরিত্যাগ করতে হবে।

৬. রিজিক অর্জন ও বৃদ্ধির জন্য কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত পন্থাসমূহ অবলম্বন করতে হবে; এর কোনো বিকল্প নেই।

৭. পৃথিবীর সকল প্রাণীর স্থায়ী এবং অস্থায়ী আবাসস্থল সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তায়ালা অবহিত। তাঁর অবগতির বাহিরে কিছু নেই।

আহবান :

মুসলিম মাত্রই বিশ্বাস করেন যে, তার আয় ও উপার্জন, জীবন ও মৃত্যু এবং সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য ইত্যাদি মায়ের পেটে থাকতেই র্নিধারণ হয়ে যায়। আর এসব তিনি লাভ করেন তার জন্য বরাদ্দ উপায়-উপকরণগুলোর মাধ্যমে। তাই আমাদের কর্তব্য হলো হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এর জন্য র্নিধারিত উপায়-উপকরণ সংগ্রহের চেষ্টা করা। যেমন চাষাবাদ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্প-চারু, চাকরি-বাকরি বা অন্য কিছু করা।

আসুন! আমরা আল্লাহর কাছে রিজিক চাই। কারন, যিনি রিজিক দেন তিনিই আল্লাহ। তিনি নিজের ওপর এটা বাধ্যতামূলক করে নিয়েছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য যে রিজিক লিখে রেখেছেন তা তিনি তাদের কাছে পৌঁছে দেবেন। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

وفـى الـسـمـاء رزقـكـم ومـا تـوعـدون ـ

‘আকাশে আছে তোমাদের রিজিক আর যা কিছু তোমাদের ওয়াদা করা হয়েছে তাও।’ (সূরা যারিয়াত : আয়াত ২২)

সুতরাং সৃষ্টির রিজিক যদি আল্লাহই জুগিয়ে থাকেন তবে কেন মানুষকে তোষামোদ করতে হবে? তবে কেন অন্যের থেকে নিজের রিজিক পাওয়ার আশায় তার সামনে নিজেকে নিচু করতে হবে? তাই আসুন! একমাত্র আল্লাহর কাছেই রিজিক চাই, অন্যের কাছে নয়। অতএব রিজিকের অভাবে বিষন্ন হবেন না। দুশ্চিন্তা করবেন না। ধৈর্যধারণ করুন ও আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এর জন্য র্নিধারিত উপায়-উপকরণ সংগ্রহের চেষ্টা করুন।                                                          

লিখেছেন : মো: মোহিব্বুল্লাহ আজাদ, লেখক, গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবীদ।